[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

স্বাগত ১৪৩৩

প্রকাশঃ
অ+ অ-
বাংলা নববর্ষের প্রবর্তক মোগল সম্রাট আকবরের পটচিত্রের সামনে ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ এলো পহেলা বৈশাখ, বাঙালিদের উৎসবের দিন। বিগত বছরের সব মলিনতা ধুয়ে-মুছে নতুন আলোয় জেগে উঠেছে বাঙালি জাতি। ১৪৩১ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে মঙ্গলবার ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন বছর ১৪৩২। পুরনোকে পেছনে ফেলে বুকভরা প্রত্যাশা, নতুন উদ্যম ও সম্ভাবনার বছরে পা রাখলো বাংলাদেশ। সব বিষণ্ণতা ঝেড়ে ভালো কিছুর আশায় নতুন বছরকে বরণ করে নিচ্ছে সবাই।

নতুন বছর মানেই রঙিন হয়ে ওঠার হাতছানি আর নতুন আশায় পথচলা। তাই পহেলা বৈশাখকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে উঠেছে সারা দেশ। এবারও বর্ণিল উৎসবে মেতেছে মানুষ। রাজধানীজুড়ে রয়েছে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠেছে চারদিক। পথেঘাটে, মাঠে ও মেলায় আনন্দঘন পরিবেশে সব বয়সীদের প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। নতুন এক আনন্দে জেগে উঠেছে গোটা জাতি।

পহেলা বৈশাখ প্রথম চালু হয় মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে (১৫৫৬-১৬০৯)। সে সময় অর্থনীতি ছিল পুরোপুরি কৃষি-নির্ভর। বাংলায় কৃষি অর্থনীতি চলত ছয় মাসের হিসেবে। মুঘল শাসনামলে কৃষকদের খাজনা দিতে হতো হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। কিন্তু ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে সেই দিনপঞ্জির মিল ছিল না। খাজনা আদায়ের সময় প্রজাদের ফসলের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। ফলে খাজনা দিতে গিয়ে কৃষক ও শাসক—উভয় পক্ষই সমস্যায় পড়ত। এর সমাধান খুঁজতে নিজের রাজসভার পণ্ডিতদের দায়িত্ব দেন সম্রাট আকবর। এই কাজের প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন ফতেউল্লাহ সিরাজী।

এরপর কৃষি অর্থনীতির ছয় মাসের আবর্তন মাথায় রেখে তৈরি হয় নতুন দিনপঞ্জি। তখন চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে এবং পহেলা বৈশাখের আগে প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের প্রস্তাব দেন রাজসভার পণ্ডিতেরা। সেই থেকে এই উদ্যোগ খাজনা আদায়ের উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। ওই উৎসবে চৈত্র মাসের শেষ দিন ছিল খাজনা পরিশোধের মাধ্যমে বছরকে বিদায় জানানো এবং পহেলা বৈশাখ ছিল ঘরে নতুন ফসল তোলার মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া।

পূর্ব পাকিস্তানে দিনটি পালিত হতো বাঙালি সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে জাতীয় উৎসব হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ। বাংলা একাডেমি ১৪ এপ্রিলকে পহেলা বৈশাখ হিসেবে স্থায়ীভাবে ক্যালেন্ডারে নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই এই দিনটিকে বৈশাখ মাসের প্রথম দিন হিসেবে গণনা করা হয়।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের সর্বজনীন উৎসব। এটি আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের পার্থক্য ভুলে পহেলা বৈশাখ আমাদের সবার জন্য হয়ে ওঠে এক আনন্দ ও মিলনের দিন। আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের ধারক হিসেবে এ উৎসবের গুরুত্ব অনেক। বৈশাখের আগমনে আমাদের জীবনে জাগে নতুন আশা, নতুন অঙ্গীকার ও অসীম সম্ভাবনার স্বপ্ন। অতীতের সব গ্লানি, বেদনা ও ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে আমরা নতুন উদ্যম ও নতুন প্রত্যয়ে এগিয়ে চলি।

তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের নতুন পথচলা শুরু হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেশ কিছু জনকল্যাণমুখী ও দূরদর্শী কর্মসূচি চালু করেছে। কৃষিনির্ভর এ দেশের প্রেক্ষাপটে মুঘল আমলে ফসলি সন প্রবর্তনের মাধ্যমে যে বাংলা সনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় পহেলা বৈশাখে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির সূচনা এক অভাবনীয় পদক্ষেপ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগ কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং কৃষকের জীবনমান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, নববর্ষের এই উৎসব ও আনন্দমুখর মুহূর্তে আন্তরিক প্রত্যাশা—সব অশুভ ও অসুন্দর দূর হোক; সত্য ও সুন্দরের জয়গান প্রতিধ্বনিত হোক সবখানে। বিদায়ী বছরের সব দুঃখ-বেদনা মুছে যাক; নতুন বছর ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। এই আনন্দঘন দিনে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আসুন আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করি; সব বিভেদ ভুলে গড়ে তুলি একটি অসাম্প্রদায়িক, ঐক্যবদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ।

নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। শত শত বছর ধরে এই দিনটি আমাদের জীবনে প্রতি বছর ফিরে আসে নতুনের ডাক নিয়ে। নতুন বছরের আগমনে পুরোনো জীর্ণতা ও গ্লানি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ জোগায়। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে এই অঞ্চলের কৃষি, প্রকৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্পর্ক খুবই গভীর। তথ্যপ্রযুক্তির এই জয়যাত্রার সময়েও প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখেই কৃষক তাঁর ফসল উৎপাদনের সময় ঠিক করেন। বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ধারা পহেলা বৈশাখের মাধ্যমে নতুন করে উজ্জীবিত হয়। বৈশাখী মেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা ও হালখাতার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আমাদের সংস্কৃতির নানা দিক ও সৌন্দর্যকে তুলে ধরে এবং আমাদের ঐক্যের চেতনায় উৎসাহিত করে। বাংলা নববর্ষ আমাদের সামনে এনেছে নতুন প্রত্যাশা ও নতুন সম্ভাবনা। প্রকৃতির নতুন করে জেগে ওঠা আর মানুষের মনের আশা মিলেমিশে তৈরি করে এক প্রাণবন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ।

তিনি বলেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ক্রীড়া কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। কৃষক ও কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে থাকা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন থেকেই শুরু হলো কৃষক কার্ড বিতরণ। আগামী দিনে এই কার্ড দেশের কৃষক ও কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারবে—নববর্ষে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমি আশা করি, দেশের মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির উদারতা ও সম্প্রীতির চর্চা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে। বিশ্ব আজ নানা সংকটে বিপর্যস্ত, এই সময়ে শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। নববর্ষের এই শুভক্ষণে আমরা যেন সব স্বার্থপরতা ভুলে মানুষের কল্যাণে কাজ করার অঙ্গীকার করি।

তিনি আরও বলেন, বছরের প্রথম ভোরে আমরা অতীতের সব হতাশা কাটিয়ে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার শপথ নিই। নববর্ষ সবার জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। দেশবাসীকে আবারও আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।

বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ উদযাপন উপলক্ষে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। রমনা বটমূলে সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) ও ছায়ানট। বর্ষবরণের অনুষ্ঠানগুলো জাতীয় সংগীত ও ‘এসো হে বৈশাখ’ গান পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রতি বছরের মতো এবারও ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’র আয়োজন করবে। এ বছরের শোভাযাত্রার মূল বিষয়বস্তু হলো—‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এই অনুষ্ঠানগুলো সব সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিওতে সরাসরি প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে।

নববর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি ও বিসিকের যৌথ উদ্যোগে একাডেমি প্রাঙ্গণে ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী মেলা, আলোচনা সভা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন সোনারগাঁ প্রাঙ্গণে ২০ এপ্রিল থেকে ১৪ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলার আয়োজন করবে।

বিশেষ দিনটি উপলক্ষে সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে উন্নত মানের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করা হবে। শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশের সব জাদুঘর ও প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা সবার জন্য খোলা থাকবে। শিশু-কিশোর, ছাত্রছাত্রী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা বিনা টিকিটে প্রবেশের সুযোগ পাবে।

দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় বৈশাখী শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। জেলা শহর ও উপজেলাগুলোতে লোকজ মেলা ও শিক্ষার্থীদের জন্য রচনা প্রতিযোগিতার ব্যবস্থাও থাকছে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ইউনিয়নে বৈশাখী শোভাযাত্রাসহ উৎসবমুখর পরিবেশে নববর্ষ পালনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দিনটি উদযাপন করবে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটগুলো নিজস্ব আয়োজনে অনুষ্ঠান করবে। অভিজাত হোটেল ও ক্লাবগুলোতেও থাকবে বিশেষ আয়োজন ও ঐতিহ্যবাহী খাবার। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কের পাশে পর্যাপ্ত চিকিৎসাকেন্দ্র, টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকবে। জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন