রাজনৈতিক সহিংসতায় তিন মাসে ৩৬ প্রাণ ঝরল
| হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) |
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে উশৃঙ্খল জনতার পিটুনি ও গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৪৯ জন। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৬৭০ জন নারী ও কন্যাশিশু।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শনিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি এই চিত্র তুলে ধরে।
এইচআরএসএস জানিয়েছে, দেশের ১৬টি জাতীয় সংবাদপত্রের খবর, নিজস্ব সংগৃহীত তথ্য এবং তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসের (জানুয়ারি–মার্চ) মানবাধিকার পরিস্থিতির এই খতিয়ান তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই তিন মাসে ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৬ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি আহত হয়েছেন ৪ হাজার ৭৮ জনের বেশি মানুষ। এসব ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিভিন্ন দলের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে।
নিহত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতের ৪ জন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ১ জন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ৩ জন রয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত তিন মাসে ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং ২ হাজার ৫৭৩ জন আহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে নির্বাচনকে ঘিরে ৬০০-র বেশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির ৮ জন, জামায়াতের ২ জন এবং আওয়ামী লীগের ১ জন রয়েছেন। এছাড়া একজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, কথা-কাটাকাটি, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে গত তিন মাসে গণপিটুনি ও উশৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণের ৮৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪৯ জন নিহত এবং ৮০ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ২৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩১ জন আহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন জায়গায় মন্দির, প্রতিমা ও ঘরবাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
রাজনৈতিক মামলা ও আটকের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিভিন্ন ধারায় অন্তত ৭৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ৮৫০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ২১ হাজার ৭৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক মামলায় আওয়ামী লীগের অন্তত ৪৩৬ জন, বিএনপির ৩১৪ জন, জামায়াতের ৭৬ জন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া এই সময়ে সারা দেশে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে ৬ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের বড় অংশই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী।
কারাগারে বন্দিদের মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের প্রথম তিন মাসে দেশের কারাগারগুলোতে অন্তত ৩৯ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১৬ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি এবং ২৩ জন বিচারাধীন হাজতি। মৃতদের মধ্যে ১২ জন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন মাসে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ১৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় ১ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪ জন গুলিবিদ্ধ। এছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত থেকে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১১টি সহিংসতার ঘটনায় ১ জন নিহত ও ৫ জন আহত হন। সেখানে আটক করা হয়েছে ৩২ জনকে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত তিন মাসে ৬৭০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪৭ জন ধর্ষণের শিকার, ১৮০ জন যৌন হয়রানির শিকার এবং পারিবারিক সহিংসতায় ১৩৬ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া ৩২৮টি কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সাংবাদিক নির্যাতন ও মতপ্রকাশে বাধা নিয়ে এইচআরএসএস জানায়, এই সময়ে ৮২টি হামলার ঘটনায় ১৭৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ১২২ জন আহত, ২০ জন লাঞ্ছিত এবং ২১ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৭টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার ঘটনায় ২০৪ জন আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, "মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি করতে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।" তিনি আরও সতর্ক করেন যে, রাজনৈতিক সহিংসতা, উশৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণ এবং মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিতে পড়বে।
Comments
Comments