মধুপুরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবার উচ্ছেদের চেষ্টা, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস
টাঙ্গাইলের মধুপুরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারী ও শিশুদের ওপর হামলা, ঘরবাড়িতে আক্রমণ ও উচ্ছেদের চেষ্টার ঘটনা সরাসরি পরিদর্শন করেছে মানবাধিকার সংস্থা ‘সিটিজেনস ফর হিউম্যান রাইটস’-এর একটি প্রতিনিধিদল। সোমবার এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। তবে ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন যে ভূমিকা নিয়েছে, তাতে তাঁরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
মধুপুরের চাঁদপুরে বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে থাকা রাবারবাগান কর্তৃপক্ষ গত ৯ মার্চ ওই এলাকায় বসবাসকারী একটি গারো পরিবারের নারী ও শিশুদের ওপর হামলা চালায়। তারা পরিবারটির বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য ঢাকা থেকে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা আজ মধুপুরের চাঁদপুরের পূর্ব ধরাটি গ্রামে যান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকারকর্মী দীপায়ন খীসা, আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি টনি ম্যাথিউ চিরান, আইনজীবীর সহকারী শামসিন্নাহার লিজা এবং সতেজ চাকমাসহ আরও অনেকে।
সাংবাদিক ও ভুক্তভোগী আদিবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমরা আপনাদের বিপদে পাশে দাঁড়াতে এসেছি। আপনারা যেন এখানে স্থায়ীভাবে থাকতে পারেন, আমরা সেই চেষ্টা করব। একটি ভালো দিক হলো, এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই। আশা করব, এমন ঘটনা যেন আর কোথাও না ঘটে, সে জন্য প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা জানিয়ে জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা দেখলাম প্রশাসন এবার ইতিবাচক ও দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে প্রশাসনের এমন উদ্যোগ দেখে ভালো লাগল। তবে কোনো নাগরিক যেন এভাবে আক্রান্ত না হয়, সে জন্য প্রশাসনকে আরও বেশি সজাগ থাকতে হবে।’
লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে পরিস্থিতি কেন এমন পর্যায়ে পৌঁছাল, তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিককেই যেন এভাবে হয়রানি করা না হয়।’
প্রতিনিধিদলটি সরেজমিন পর্যবেক্ষণে জানতে পারে, ৬০ বছর বয়সী রমেন কুবি নামের এক গারো ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ৫ শতাংশ জমির ওপর আট বছর আগে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। সেই জমিতে তিনি আম ও কাঁঠাল গাছও লাগিয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি সেখানে নতুন একটি ঘর তৈরির কাজ শুরু করলে গত ৯ মার্চ বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের কর্মকর্তারা আনসার সদস্যদের নিয়ে এসে তাঁকে বাধা দেন। তাঁরা ঘরের খুঁটি ভেঙে ফেলেন এবং তাঁর লাগানো আম ও কাঁঠাল গাছগুলো উপড়ে ফেলেন।
অভিযান চলাকালে আনসার সদস্যরা ওই গারো পরিবারের এক নারী সদস্যের দিকে রাইফেল তাক করে ভয় দেখান, যার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নজরে আসার পর গত ১০ মার্চ মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মির্জা জুবায়ের হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি রাবারবাগান কর্তৃপক্ষ এবং ভুক্তভোগী রমেন কুবি ও শিবলী মাংসাং দম্পতির সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে পুনরায় ঘর নির্মাণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে দুই বান্ডিল ঢেউটিন ও ৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া ভবিষ্যতে ইউএনও এবং পুলিশ পরিদর্শককে (ওসি) না জানিয়ে এ ধরনের কোনো অভিযান না চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

Comments
Comments